মসলায় ইটের গুঁড়া বিষাক্ত রঙ

1

অনলাইন ডেস্ক:

গ্যাস্ট্রিক আলসারের মতো কঠিন রোগ বাসা বাঁধছে মানব শরীরে, হচ্ছে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধি

মসলায় ইটের গুঁড়া বিষাক্ত রঙ
বাঙালির রসনাবিলাসে রান্নায় মসলা ব্যবহারের রীতি সেই মোগল আমল থেকেই চলছে। একেক মসলার রয়েছে ভিন্ন স্বাদ ও গন্ধ। এর ফলে একেক মসলা খাবারে আনে একেক রকমের স্বাদ। কিন্তু প্রতিদিনকার খাবারকে সুস্বাদু করতে যেসব মসলা ব্যবহার করা হয় তা মোটেও নিরাপদ নয়। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, বাজার থেকে কিনে ভোক্তারা যেসব মসলা তরকারিতে দিচ্ছে তার ৯০ ভাগই ভেজাল। মসলায় আবারও মেশানো হচ্ছে ইটের গুঁড়া, টেক্সটাইলের বিষাক্ত রঙ, কাঠের ভুসি, চালের তুষ, সিঁদুর, পচা গম, পচা ভুট্টা, ঘাসের বীজ ও গাছের গুঁড়া। অসাধু ব্যবসায়ীরা মসলায় এসব বিষাক্ত উপকরণ মিশিয়ে প্রতিনিয়ত বিক্রি করছে। তারা কারখানাতে প্যাকেটজাত করে এবং খোলাবাজারে এসব মসলা সরবরাহ করছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাসহ সারা দেশে।

সময়ের আলোর অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে মসলায় ভেজাল মেশানোর ভয়াবহ চিত্র। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট, কল্যাণপুর এবং মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বেশ কিছু এলাকায়ও ভেজাল মসলা তৈরির কারখানার সন্ধান মিলেছে। এসব স্থানে মসলা ভাঙানোর মিলে প্রতিদিন মণকে মণ মসলা তৈরি করা হচ্ছে, যার পুরোটাই ভেজাল।

ভেজাল মসলা খেলে কি হয় এ প্রশ্নে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, খাবার অযোগ্য উপাদান দিয়ে তৈরি এসব মসলা খেলে হতে পারে মারাত্মক পেটের সমস্যা। এমনকি গ্যাস্ট্রিক, আলসারে মতো কঠিন রোগও বাসা বাঁধতে পারে শরীরে, হতে পারে ক্যানসারের মতো মারণব্যাধিও। অতিরিক্ত মাত্রায় এই মসলা পেটে গেলে যে কেউ হতে পারে ফুড পয়জনিংয়ের শিকার।

ল্যাবএইড হাসপাতালের গ্যাস্ট্রোএন্টিরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মাহমুদ হাসান সময়ের আলোকে বলেন, টেক্সটাইলে ব্যবহৃত রঙ খাবার উপযোগী নয় কোনোভাবেই, কিন্তু আমাদের দেশে মসলাজাতীয় পণ্যে এর ব্যবহার হচ্ছে হরহামেশা। প্রথমদিকে এসব কেমিক্যাল রঙ পেটে গেলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয় এবং পরে তা ধারণ করে ক্যানসারের রূপ। এসব খাওয়ার ফলে হেপাটাইসিসসহ কিডনিজনিত আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়াও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে মসলাগুলো তৈরি হওয়ায় এতে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জীবাণুও থাকে, যার ফলে বদহজম, ক্রিমি, বমিবমি ভাব ও ক্ষুধামন্দার মতো অসুবিধার সৃষ্টি হয়। ভেজালযুক্ত মসলার হুমকি বড়দের থেকে শিশু ও নবজাতকদের জন্য আরও বেশি। এটি শিশুদের শারীরিক বর্ধনশীলতা ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে, তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যার ফলে সামান্য কারণেই অসুস্থতার শিকার হচ্ছে বাচ্চারা বা অসুখ হলে দ্রুত সেরে উঠতে পারছে না। অন্তঃসত্ত্বার খাবারে দূষিত মসলার প্রয়োগে তার গর্ভের সন্তান প্রতিবন্ধী ও অপুষ্ট হয়ে জন্ম নিতে পারে, এ ছাড়াও রয়েছে গর্ভপাত ও প্রসবকালীন জটিলতার সম্ভাবনাও।

কোন মসলায় কি মেশানো হচ্ছে : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হলুদের গুঁড়ার সঙ্গে মিশছে সিসা, ডালের গুঁড়া, কাঠের গুঁড়া, ইটের গুঁড়া, মটরের গুঁড়া, টেক্সটাইলের বিষাক্ত রঙ, ক্ষার জাতীয় পদার্থ চুন ও সোডা, চালের কুঁড়া, কাউন ধান ও পচা মরিচের গুঁড়া। আর মরিচের গুঁড়ার সঙ্গে মেশানো হচ্ছে ইটের গুঁড়া, ডালের গুঁড়া, চুন ও সোডা, চালের কুঁড়া, কাউন ধান, পচা মরিচের গুঁড়া, টেক্সটাইলের রঙ, লোহার মরিচা, পচা আটা, পচা ময়দা ও পচা হলুদ। ধনিয়ার গুঁড়া ভেজাল হচ্ছে কাঠের গুঁড়া, টেক্সটাইলের রঙ, নষ্ট সেমাই, স’মিলের কাঠের ভুসি, আটা ও নষ্ট তেজপাতায়। পেস্তাদানায় মেশানো হচ্ছে নষ্ট সুজি। তা ছাড়া বিভিন্ন মশলায় ধানের ভুসি, কাঠের গুঁড়া, বালি ও ইটের গুঁড়া।

তা ছাড়া বাজারের প্রচলিত মরিচের গুঁড়ার মধ্যে অন্যান্য ভেজাল উপকরণ মেশানোর পাশাপাশি ৩০ শতাংশই থাকে মরিচের বোঁটার গুঁড়া, যা খাদ্যের কোনো অংশ নয় এবং ওজন বাড়ানো ছাড়া এর অন্য কোনো ভূমিকা নেই। ফলে ভোক্তা প্রতিনিয়তই মরিচের আসল স্বাদ, রঙ ও গন্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং মরিচের সঙ্গে বোঁটার গুঁড়াও খেতে হচ্ছে ভোক্তাকে।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের নমুনা পরীক্ষায় ভয়াবহ তথ্য : জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সম্প্রতি বাজার থেকে ভোগ্যপণ্য পরীক্ষার জন্য দৈব চয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন মসলার নমুনা সংগ্রহ করে। ভোগ্যপণ্যে কী পরিমাণ ভেজাল আছে তা দেখতে তারা প্রতিবছরই এই পরীক্ষা করে। সরকারি এ প্রতিষ্ঠান সারা দেশ থেকে ৪৩টি ভোগ্যপণ্যের মোট ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, তাদের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে খাবারের তালিকাভুক্ত ৪৩ ধরনের পণ্যেই ভেজাল পাওয়া গেছে। ভেজালের পরিমাণ গড়ে শতকরা ৬০-৯০ ভাগ। এর মধ্যে ১৩টি পণ্যে ভেজালের হার প্রায় শতভাগ।

প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষায় দেখা গেছে নিত্যদিনের রান্নায় ব্যবহৃত সয়াবিন তেল আছে ভেজালের শীর্ষে। সয়াবিন তেলে ফলিক অ্যাসিড পাওয়া গেছে শতকরা দুই দশমিক আট ভাগ। ফলিক অ্যাসিডের সহনীয় মাত্রা হচ্ছে শতকরা দুই ভাগ। ফলিক অ্যাসিডসহ অন্য সব মিলে সয়াবিনে ভেজালের মাত্রা হলো শতকরা ৭৮ ভাগ। এ ছাড়া সরিষার তেলে ৫৬ ভাগ, পাম অয়েলে ৩২ ভাগ, নারিকেল তেলে ২৫ ভাগ ভেজাল। বাকি পণ্যগুলোতে জিরার গুঁড়ায় ২৮ শতাংশ, মরিচের গুঁড়ায় ৭০ ভাগ, হলুদ গুঁড়ায় ৮০ ও ধনিয়ার গুঁড়ায় ৫৩ ভাগ ভেজাল চিহ্নিত হয়েছে। তা ছাড়া আটায় ভেজালের পরিমাণ শতকরা ১১ ভাগ, ময়দায় ৯ ভাগ, সুজিতে ২৭ ভাগ, বিস্কুটে ৪৬ ভাগ, বেসনে ৫২ ভাগ ও সেমাইয়ে ৮২ ভাগ।

সরেজমিন তথ্য : সরেজমিনে দেখা গেছে, মসলায় ভেজালকারীদের বিরাট সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা মসলার ভেজাল মেশানোর উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ভেজাল মসলা বিভিন্ন মার্কেটের পাইকারি, খুচরা ব্যবসায়ী এমনকি প্যাকেটজাত মসলার বাজারজাতকারী অনেক বড় কোম্পানিকেও তারা সরবরাহ করছেন। এসব কোম্পানি চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং ক্রেতাকে ধোঁকা দিয়ে খাঁটি মসলা বলে বিক্রি করছে দেদারছে।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি সবজি মার্কেটের একেবারে মাঝখানে রয়েছে মসলা ভাঙানোর ১৮টি মিল। এসব মিলে মূলত মরিচের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়া ও ধনিয়া গুঁড়া বেশি তৈরি করা হয়। মিলগুলো ২০-২৫ বছরের পুরনো। এই দীর্ঘ সময় ধরেই এখানকার মিলগুলোর ভেজাল মসলা তৈরির কুখ্যাতি রয়েছে। মাঝে মধ্যেই এখানে র‌্যাব, ভোক্তা অধিদফতর ও বিএসটিআই অভিযান চালায় এবং ভেজাল মালামাল জব্দ করে। এমনকি মিলের মালিক-কর্মচারীদের জেল-জরিমানাও করা হয়। গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন সময় এখানে অনুসন্ধান চালানো হয়। এই প্রতিবেদক প্রথমে ক্রেতা সেজে মসলা আনতে গেলে বলা হয়, কোন গ্রেডের মসলা নিতে চান। এখানে নাকি এ, বি, সি ও ডি-এই চার গ্রেডের মসলা বিক্রি করা হয়।

মজার বিষয় হচ্ছে সব গ্রেডের মসলাতেই কোনো না কোনো ভেজাল পণ্য মেশানো রয়েছে, তবে কোনোটাই কম, কোনোটাতে বেশি। ‘এ’ গ্রেডের মসলায় ২০ শতাংশ ভেজাল, ‘বি’ গ্রেডের মসলায় ৪০ শতাংশ, ‘সি’ গ্রেডের মসলায় ৬০ শতাশং এবং ‘ডি’ গ্রেডের মসলায় ৮০ শতাংশ ভেজাল।

গ্রেড অনুযায়ী মসলার দামেও তারতম্য রয়েছে। এখানকার একটি মিলের কর্মচারী আবু আলমের কাছ থেকেই এসব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। কিন্তু যখনই সাংবাদিক পরিচয় পেলেন তিনি, সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। আশপাশের কয়েকটি মিলের কর্মচারীকেও ডেকে আনেন তিনি। ৮-১০ জন মিলে ঘিরে ধরে বলতে থাকেন আপনাদের মতো সাংবাদিকদের কারণেই আমাদের ব্যবসা বন্ধ হতে চলেছে। আপনারা উল্টা-পাল্টা লিখে আমাদের সর্বনাশ করছেন। কিন্তু আপনারা তো মসলায় ভেজাল মেশাচ্ছেন এটা তো মহা অপরাধ, মানুষের সর্বনাশ করছেন আপনারা। এর জবাবও তাদের কাছে প্রস্তুতÑ ‘বড় বড় সব কোম্পানিই ভেজালের ব্যবসা করছে, আপনারা তাদের চোখে দেখেন না, পান শুধু আমাদের।’

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটে রয়েছে ১০টির মতো মসলা ভাঙানো মিল। এ ছাড়া কল্যাণপুর নতুন বাজার ও মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনেও বেশ কয়েকটি মসলা ভাঙানোর মিলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব স্থানের মিলেও মসলায় ভেজাল মেশানোর প্রমাণ মিলেছে।

ভেজাল খাদ্যে খেয়ে জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য বিষযুক্ত খাদ্যকে দায়ী করা হচ্ছে।

আর কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। ভেজাল মসলা ও রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং সরকারি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ক্যানসার রোগীর সংখ্যা ২০১২-২০১৩ সময়কালের ২ লাখ ৩২ হাজার ৪৫৬ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। ক্যানসার রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনেও ভেজাল খাদ্যকে দায়ী করা হচ্ছে।