পথচলতি জটলা থেকে প্ল্যাটফর্মের সভা – সব পথ মিলে যাচ্ছে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে- দিল্লির কৃষক জমায়েতে

0

শোভন চক্রবর্তী। মহেশতলা। ৯ জানুয়ারি, ২০২১।#
 
সোয়া দুটোর ট্রেনটা চলে যেতেই স্টেশনটা অনেক ফাঁকা হয়ে গেল। আশপাশে দু-চারজন মানুষ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শুরুই করে দিলাম সভা। মহেশতলার-মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলের বিভিন্ন ছোটো পত্রিকা আর স্থানীয় কবি-লেখক-শিল্পীদর যৌথ আয়োজনে বজবজ-শিয়ালদহ শাখার এই সন্তোষপুর স্টেশনে। শুরুর সুরটা ধরে দিলেন জিতেন, রাখী, বনশ্রী, রাজেশ আর অমিতারা। কবীরের গান দিয়ে — ‘সাঁধো, দেখো রে জগ বওরানা রে’। দেখো, জগৎটা কেমন উন্মাদ হয়ে উঠেছে! লোক জড়ো হতে থাকল।
সভা তখন গতি পেয়ে গেছে। কেন্দ্রের তিন কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে সিঙ্ঘুতে অবস্থান চালিয়ে যাওয়া কৃষকদের সমর্থনে কথা-কবিতায়-গানে সুর জোরালো হচ্ছে। হঠাৎই কানে গেল, জমায়েতের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ কিছু বলছেন। আমি বললাম, বাইরে না, জমায়েতেই আপনি আপনার কথা বলুন। অনুরোধ জানালাম। নিজের কথা শুরু করলেন শেখ ওসমান : আমার দর্জিভাইদের বলি। আমরা যে কাপড় সেলাই করি, বলো তো সেই কাপড় কী দিয়ে তৈরি হয়? জমায়েত থেকে উত্তর এল — ‘সুতো’। — সুতো কোত্থেকে আসে? — ‘তুলো থেকে’। — আর এই তুলো আসে আমাদের চাষিভাইদের কাছ থেকে। তাদের পেটে লাথি পড়েছে। আমরা কি চুপ করে থাকব?
সকলে ধীরগতিতে মাথা নাড়তে থাকল। আন্দোলনরত কৃষকদের দাবিগুলো কেন সবার দাবি, কীভাবে মহেশতলা-মেটিয়াবুরুজের দর্জিশিল্পের কর্মচারীদের সঙ্গে হরিয়ানা-পাঞ্জাব-রাজস্থানের কৃষকদের স্বার্থ জড়িত, বলতে থাকলেন ওসমান। হয়তো এভাবে এই প্রথম কোথাও তিনি বললেন। হয়তো এই প্রথম তাঁর কথা এত মন দিয়ে শুনলেন অনেকে।
সভা চলতে থাকল। বাড়তে থাকল মানুষের মুখও। হঠাৎই এক অফিসার-সমেত একদল আরপিএফ কর্মী এসে বললেন সভা বন্ধ করতে হবে। কোনো মাইক না, খালি গলাতেই তো সভা চলছিল। তাহলে বন্ধ করতে হবে কেন! উর্দিধারীরা যুক্তিতে যেতে নারাজ। তারা জোর খাটাতে শুরু করলেন — ‘বন্ধ করুন, বন্ধ করুন’। তখনই পিছনের সারি থেকে এগিয়ে এলেন এক রেলযাত্রী।
বক্তব্য রাখছিলেন ওসমান কাকা। — ছবি- অন্বেষা চক্রবর্তী— ট্রেন কেন ঠিকমতো চলছে না বলুন তো?
প্রথম উর্দিধারী জবাব দিলেন :
— ঠিকই চলছে। টিকিট কাউন্টারের ওপর টাইম টেবিল দেখে নিন।
— দেখা আছে। যখন তখন কিছু না জানিয়ে ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছে কেন? আগে নিয়ম করে ট্রেন চলুক, তারপর কথা বলতে আসবেন। দ্বিতীয় উর্দিধারী বিপদ বুঝে আমাদেরই একজনের পাশে এসে বললেন :
— অফিসাররা এসেছে, পাঁচ মিনিট বন্ধ রাখুন না।
উর্দিধারীরা চলে গেল। জনতার সম্মিলিত বাধায় পিছু হটল উর্দিধারীরা। সভা শুরু হল ফের।
বাজারচলতি মিডিয়া সিঙ্ঘু সেন্সর করছে। কিন্তু সেখানে কী চলছে তা পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। দমদম থেকে এদিনের সভায় এসেছিলেন পাঞ্চালি। সিঙ্ঘুর অবস্থানে গিয়েছিলেন তিনি। বললেন, কী অসম্ভব ধৈর্য, মনের জোর আর একতা নিয়ে লড়াই চালাচ্ছে কৃষকরা। সিঙ্ঘুতে গিয়েছিলেন একসময় এই অঞ্চলের বাসিন্দা অধুনা টালিগঞ্জনিবাসী ফারুক-ও। তিনিও জানালেন, কীভাবে বাইরে থেকে লোক ঢুকিয়ে আন্দোলনকে বদনাম করার চেষ্টা চালাচ্ছে শাসকশক্তি। কী অসীম আগ্রহে বাংলার মানুষকে পাশে চাইছে আন্দোলনকারীরা। খবরকাগজ, টিভিপর্দায় যে-খবর আসেনি, আসে না, সে-ই খবরের সরেজমিন খোঁজ তখন দিচ্ছেন পাঞ্চালি, ফারুকরা। একক পথনাটকে মানুষের জোটবদ্ধতার কথা জানাচ্ছেন অঙ্কুর।
প্ল্যাটফর্মের পিছনের রেলিংয়ের গায়ে সারি সারি ঝোলানো ছিল পোস্টার। একটা পোস্টারে ছিল ৪ তারিখ পর্যন্ত ৫৭ জন আন্দোলনরত কৃষক শহিদদের একটা তালিকা। সেটা দেখিয়ে আমি বললাম, আসুন আমরা সকলে এক মিনিট নীরবতা পালন করি, ওঁদের শ্রদ্ধা জানাই। একটা ছোট্ট জমাট ভিড় নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ১নং প্ল্যাটফর্ম থেকে কে যেন চেঁচিয়ে বলল, কী হচ্ছে রে ওখানে? দু-একজন ছুটে এসে দেখল, একদল মানুষ মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। নীরবতা কথা বলে উঠল, নিমেষে।